Subscribe Here





জীবনযুদ্ধে “আহত” “নিহত” ও “বিজয়ী” মানুষদের জন্য (পর্ব-৩)

Category: Education, Bangladesh | Date: 20-08-13 By Nazmus Sadat

এক রাজা রাজ্যহারিয়ে একাকী ঘুরতে বেরিয়েছেন।সমুদ্রের তীরে ঘেঁষে ঘুরতে ঘুরতে রাজা দেখা পেলেন এক বালকের। বালকটি বিভিন্ন জায়গা থেকে কাঠ সংগ্রহ করে একটা নৌকাবানানোর চেষ্টাই রত। রাজা তখন বালকটির কাছে যেয়ে জানতে চাইলেন তার অমন নৌকাবানানোর কারণ কী! জবাবে বালকটি বলল, আমাকে যুদ্ধের সময় তুলে নিয়ে এসেছে।সমুদ্রের ওপাশে আমার বাড়ি।আমি আমার মায়ের কাছে যেতে চাই।বালকেরকথা শুনেরাজা একেবারে থ মেরে গেলেন।এই বিশাল উত্তাল সাগরকে পেছনে ফেলে বালকটি কিনাযেতে চাইছে তার মায়ের কাছে।রাজা এবারে তার বিশেষ কিছু সঙ্গীকে ডেকেছেলেটিকে সমুদ্রের ওপাশে তার মায়ের কাছে পাঠিয়ে দিলেন।এবারে রাজা ভাবতেলাগলেন, ছোট্ট ঐ ছেলেটির একার পক্ষে হয়তো সমুদ্র পাড়ি দেওয়া সম্ভব ছিল নাকিম্বা হয়তো পাড়ি দিতে পারতো ।তবু ছেলেটি বসে না থেকে সমুদ্র পাড়ি দিতেমনস্থ করেছিল।কি অদম্য সাহস তার, অথচ রাজা হয়েও এমন রাজ্য হারা হয়ে তিনিঘুরছেন অথচ একবারও হারানো রাজ্য জয় করার চেষ্টা করছেন না।এবারে তিনি তারবিশেষ কয়েকজন সহচরদের সাথে বৈঠকে বসলেন এবং কিভাবে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে আনাযাই তার পরামর্শ করতে লাগলেন।অবশেষে পরামর্শ এবং বুদ্ধি মোতাবেক শেষমেশরাজা আবার যুদ্ধ করলেন এবং তার হারানো রাজ্য পুনঃরায় উদ্ধার করলেন।

উপরের গল্পটি আসলে কোনও মিথ্যা গল্প নয়,এটি ছিল ফরাসি সম্রাট ও সমর নায়ক নেপোলিয়ান এর ব্যাক্তিগত জীবনের সত্য গল্প।

চেষ্টাযারাই করেছেন তারাই সফল হয়েছেন,অদম্য ইচ্ছা আর সাহস নিয়ে ইতিহাস রচয়িতারাদেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে জয় করতে হয়।কাজে বাঁধা আসবে এটাই স্বাভাবিক,তবে যদিএগিয়ে যেতে পারেন তাহলে একসময় না একসময় সাফল্য অবশ্যই পাবেন।সাফল্য এমনকোনও বস্তু নয় যা কিছু মানুষের জন্যই সীমাবদ্ধ, বরং সাফল্য এমন এক সীমাবদ্ধজিনিস যা শুধু পরিশ্রমী আর ধৈর্যশীল মানুষের জন্যই অপেক্ষা করছে।রাইট ভ্রাতৃদ্বয় আকাশে ওড়ার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করতে লাগলেন।তারা এমনএকটা যন্ত্র আবিস্কার করতে চাইলেন যা আকাশে উড়বে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এর এমনকথা পৌঁছে যায় সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিকট।দিনটা ছিল ১০ই ডিসেম্বর ১৯৩০। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এর জ্ঞান বুদ্ধি নিয়ে প্রশ্নতোলে তৎকালিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকা।পত্রিকায় ছাপা হয়তাদের“বিদঘুটে” চিন্তা ধারার উপর একটি বিশেষ প্রতিবেদন। সেখানে বলাহয়- “রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এমন কিছু তৈরি করতে চাচ্ছে যা বাতাসের চেয়ে ওজনে হালকাআবার তা নাকি আকাশে উড়বে”! সবার মুখে মুখে কথাটা তখন কৌতুক সুলভ আচরনে পরিণত হল।কিন্তূ ওদিকে,এই সংবাদ প্রকাশ করার মাত্র এক সপ্তাহ পরেই সকলের চোখেবৃদ্ধাঙ্গুল প্রদর্শন করে “কিটিহক” থেকে রাইট ভ্রাতৃদ্বয় তাদের উদ্ভাবিতযন্ত্রনিয়ে আকাশে উড়ে যান, যার পরবর্তী কাহিনী প্রায় সকলেরই জানা।

রাইটভ্রাতৃদ্বয়ের সফল হবার স্বপ্নকে কেও মেনে নেয়নি।অথচ তারা করে দেখিয়েছেন- “এটা সম্ভব”।মানুষ তাদেরকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করেছিল অথচ তাদের একটাই লক্ষ্য ছিল, “করেদেখাবোই” আর সত্যিই তারা তা করে দেখিয়েছেন।একেই বলে সফল হবার নেশা যখন মানুষের কটুকথাও কর্ণে শ্রবণের সময় হবে না।লক্ষ্যটাই হল এখানে জরুরী, যার ফলাফল শুধু তুমি দেখতে পাবে, অথচ তোমারস্বপ্ন কারও কারও কাছে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে যারা নিজেরাই কোনও স্বপ্নদেখতে জানেনা ফলে তারা থামাতে চাইবে তোমাকে ,তোমাকে বানাবে হাসির খোরাকে।সুতরাং নিজের প্রতি বিশ্বাস আনো, চিন্তা করো যা করতে চাইছো তা করতে পারলেসত্যি সত্যিই একটা কিছু বয়ে আসবে কিংবা ঘটে যাবে কোনও যুগান্তকারী ঘটনা।

বাবারপাশে ঘুমিয়ে রয়েছে তার ছোট্ট ছেলে। হঠাৎ ছেলেটির ঘুম ভেঙ্গে গেল।ছেলেটা তার বাবাকে বলল, “বাবা! আমি খুব খারাপ একটা স্বপ্ন দেখেছি”! বাবা বললেন, “কি স্বপ্ন?” ছেলে বলল, “আমি দেখলাম- যুদ্ধ বেধে গেছে। মানুষজন সবাই ছুটে পালাচ্ছে।চারিদিকে শুধু হাহাকার।মানুষজন সবাই ভয়তে চিৎকার করছে”।বাবা বললেন, “তারপর?” ছেলে বলল, “তারপর দেখি যুদ্ধের ভেতর আমি একা একা দাড়িয়ে আছি। আমাকে সাহায্যকরবার কেও নেই।একটুপর একটা প্লেন এসে বোমাবর্ষণ করলো, আমার পাশেই অনেকগুলোবোমা পড়লো।কি বিকটতার আওয়াজ! আমি ছুটে পালাতে যাবো ঠিক এমনসময় আমার ঘুমভেঙ্গে গেল!” ছেলে আবার বলল, “বাবা,আমি খুব ভয় পেয়ে ছিলাম”।বাবা বললেন, “আমি জানি”।ছেলে বলল, “তাহলে তুমি বুঝতে পেরেছিলে যে আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছি?” বাবা বললেন, “অবশ্যই”!! ছেলে বলল, ‘তাহলে তুমিই আমার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছ?” বাবা বললেন, “না, আমি তোমার ঘুম ভাঙ্গাইনি”।ছেলে বলল,তাহলে আমি খারাপ স্বপ্ন দেখছি জেনেও স্বপ্নের শুরুতেই তুমি আমারঘুম ভাঙ্গাওনি কেন?” বাবা বললেন, “কারন তুমি যা দেখেছ ওগুলো স্বপ্নের ভেতর ছিল। কিন্তুবাস্তবেতো তুমি আমার পাশে খুব নিরাপদেই ছিলে! কিন্তু একটু পর তোমারস্বপ্নের ভেতরে তুমি যখন খারাপ অবস্থার ভেতর চলে গিয়েছিলে ঠিক তখনই নিজেনিজেই আবার স্বপ্নথেকে বেরিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়েছ”।ছেলে বলল, ‘তাইযদি হয় বাবা,তাহলে কি আমি সকল খারাপ অবস্থার ভেতরে ইচ্ছামতচাইলেই আমি আবার ভালো অবস্থানে ফিরে আসতে পারবো?” বাবা বললেন, “অবশ্যই পারবে!! তবে তার জন্য তোমার ফিরে আসার ইচ্ছা থাকালাগবে”!!

পৃথিবীটা সত্যিই দুঃস্বপ্নে পরিপূর্ণ।এখানে যা কিছু চাইতেযাবে তাতেই দেখবেন দুঃস্বপ্নের মতো কিছু খারাপ জিনিস নিজের পিছু লেগেছে।ওগুলো তোমাকে ছাড়তে চাইবেনা- বরং ওগুলো থেকে তোমার নিজেকেই সাবধানে থাকতেহবে। রাগ- ক্ষোভ- হতাশায় জীবন ভেঙ্গে যাওয়ার উপক্রম হবে- কিন্তু নিজে থেকেইযদি আবার ফিরে আসার ইচ্ছাপোষণ করো তাহলেই আবার ফিরতে পারবে আলোরপথে।জগতে ভালো-মন্দ যাই কিছু করো ,তাতে নিজের স্বদিচ্ছা থাকাটাই হলগুরুত্বপূর্ণ।আর স্বদিচ্ছা যদি থাকে- তাহলে সফল হওয়াটাও খুব একটা কঠিন কিছুনয়!আবার তোমার কি নেই, সেসব নিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো অর্থ নেই, যা হয়ে গেছেতাকে ঝেড়ে ফেলে দাও শুধু ভুল থেকে শিক্ষা নাও। জীবন এখন অনেক বেশিপ্রতিযোগিতাময়,পুরনো চিন্তা আর অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে এগুতে পারবে না। "জীবনটা একটা প্রতিযোগিতা। দৌড়ই হল এখানে একমাত্র খেলা। নিয়ম বলে এখানেকোনও কথা নেই, শুধু তোমাকে দৌড়াতে হবে। কেও কেও দৌড়ায় সামনের দিকে আর কেওপেছন দিকে। এখন তুমি ঠিক করে নাও কোনদিক ধরে দৌড়াবে। তবে খেলায় যখন নেমেছোঅবশ্যই তোমাকে জয়ী হতেই দৌড়াতে হবে আর সেই দৌড়টি হবে সামনের দিকে।" --জে.ডিইক১৮নভেম্বর,১৯৯৫। "ইটঝাক পার্লম্যান"-আমেরিকান বিখ্যাত বেহালাবাদক; নিউইয়র্কের লিঙ্কনসেন্টারে জনসম্মুখে বেহালা বাজাতে স্টেজে উঠছেন।পোলিও রোগে আক্রান্ত পার্লম্যান চলতে ফিরতে দুটি ক্র্যাচের সাহায্য নেন!যথারীতি তিনি ক্র্যাচ ভর দিয়ে অত্যন্ত কষ্ট ভারি মুখ নিয়ে স্টেজে উঠলেন।চেয়ারে বসতে কিছুটা সময় লাগলো। এরপর বেহালাখানা হাতে নিয়ে ঘাড়ের উপর ভর করেরেখে এবারে আস্তে আস্তে করে বাজাতে শুরু করলেন। উপস্থিত দর্শকশ্রোতারাতার বাজানোটা বেশ উপভোগ করছে ঠিক এমনসময় একটা কিছুর শব্দ হবার সাথে সাথেপার্লম্যান বেহালা বাজানো বন্ধ করে দিলেন।এরপর খানিকটা বিরতি নিয়ে আবারবাজানো শুরু করলে কিছুক্ষণ বাদে আবারও কিছু একটা শব্দ শুনে পার্লম্যানবাজানো বন্ধ করে দিলেন। এভাবে বেশ কবার এমন হল কিন্তু প্রতিবারই পার্লম্যানথেমে যাবার পর পুনঃরায়যখন শুরু করছিলেন তখন প্রতিবারি তিনি তার বেহালাতেনিত্যনতুন সুর সৃষ্টি করছিলেন যা উপস্থিত দর্শকদেরবিমোহিত করে দিচ্ছিল!!কিন্তু দর্শকদের কেউই বুঝতে পারেননি যে পার্লম্যান কেন বারে বারে বিরতিদিচ্ছিলেন।এবারে তিনি যখন স্টেজ থেকে নেমে আসলেন তখন তার হাতে ছিঁড়া ফাটা বেহালা দেখেসবাই অবাক দৃষ্টিতে তারদিকে তাকিয়ে থাকে।পার্লম্যান তখন তাদের বিস্ময় ভাঙ্গাতে বলেন, "বেহালা বাজানো অবস্থায়বেহালার মাত্র তিনটা তার বাদে বাকি সবকটা তার ছিঁড়ে যায়। ছিঁড়ে যাবার জন্যইস্টেজে তখন ছেঁড়ার শব্দ হয়েছিল। কিন্তু যখনি তার ছিঁড়ে যায় তখনই আমিচিন্তায়পড়ে যাই এখন কিভাবে বাজাবো। কিন্তু আমি বেশীক্ষণ চিন্তা করার সময়নেইনি, আমি তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেই – যে কটা তার ছিঁড়ে গেছে তা সারানোসম্ভব নয়, কিন্তু যে তিনটা তার অবশিষ্ট আছে তাই দিয়েই এমন শব্দের সৃষ্টিকরতে হবে যেন ছিঁড়ে যাওয়া তারের অভাবটা এখন পূরণ হয়ে যায়। তাই সে অনুপাতেইআমি বাজাতে থাকিআর প্রত্যেক বার ভিন্ন ভিন্ন সুরের সৃষ্টি করি"।সবাই তখন পার্লম্যানের কথা শুনে করতালি দিতে থাকে। ------------ যা কিছু জীবন থেকে চলে গেছে বা মুছে গেছে তাকে আর ফেরানো যাবেনা, তবে যাকিছু আছে তাই দিয়েই এমন কিছু করা সম্ভব যার মাধ্যমে পেছনের জীবনের অনেককিছুর অভাবই পূরণ হয়ে যায়।সফল হওয়া মানে একটা মাত্র জিনিসই আঁকড়ে ধরা নয়, বরং যে জিনিসে সম্ভব তাই গ্রহন করে সফল হবার চেষ্টা করা।উডি অ্যালেনএর ভাষায়-" যদি আপনি চলতে যেয়ে কয়েকবার পড়ে যান তবে বুঝবেন আপনিচালকের আসনেই রয়েছেন এবং এটাই সঠিক অবস্থান। কেননা হাঁটতে হাঁটতে যেমনক্লান্ত হয়ে পড়ে যাবার ভয় থাকে, তেমনি ভাবে কাজের ফাঁকে একটু বিফল হতেইহবে। কেননা সফল হবার রাস্তাটা বিফল হবার মাধ্যমেই প্রকাশ পায়"।মায়া অ্যাঞ্জেলোর ভাষায়-"যাই কিছু ঘটুক, বিশ্বাস রাখতে হবে এটার শেষঅবশ্যই আছে তাই শেষ মুহূর্তের জন্যই আমাদেরকে খাটতে হবে"।একই কথা বলেন জে.ডি.ইকবা-"কি ঘটছে সেটা কোনও ব্যাপার না, কি ঘটবে সেটাওকোনও ব্যাপার নয়, বরং আমরা নিজেরা নিজেদেরকে নিয়ে কি ঘটাতে যাচ্ছি সেটাই হলমূল ব্যাপার।"অতএব আর নয় বসে থাকা, আর নয় হতাশা। আজ এই মুহুর্তে অর্থাৎ এক্ষুনি নতুন করেভাব, নতুন করে নব উদ্দীপনা নিয়ে তোমার লক্ষ্যে পৌছাতে ঝাপিয়ে পড়ো। আর নয়পিছুটান, আবার আলোর পথে ধীর কিন্তু দৃড় পদক্ষেপ-এ এগিয়ে চলো।উন্নতি বাইতিবাচক পরিবর্তন অল্প হোক কিন্তু তা যেন হয় ক্রমাগত বর্ধনশীল।এভাবেইঅল্প-অল্প করে দেখবে একদিন তোমার অনেকদূর পাড়ি দেওয়া হয়ে গেছে। তোমাদেরউত্তরোত্তর শুভ কামনায় “লাইফ কার্নিভাল” টীম। (চলবে......সাথেই থাকো! বিঃদ্রঃ লেখাটি বিভিন্ন সংগৃহীত লিখা ও ঘটনা অবলম্বনে রচিত)